
ভায়া, ইতিহাসের ধুলোবালি ঝেড়ে একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাইলে আপনাকে আগারগাঁওয়ের এই আধুনিক ইমারতে একবার আসতেই হবে। ১৯৯৬ সালের ২২ শে মার্চ সেগুনবাগিচার এক ভাড়া বাসায় যে যাত্রার শুরু, আজ তা পনেরো হাজারেরও অধিক দুর্মূল্য সংগ্রহের এক বিশাল ভাণ্ডার। ২০১৭ সালে আড়াই বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই নতুন ভবনে যখন জাদুঘরটি এলো, তখন যেন বাঙালির আত্মত্যাগের গল্পগুলো এক নতুন প্রাণ পেল।
সৈয়দ মুজতবা আলীর ঢঙে বলতে গেলে বলতে হয়—এ কেবল কাঁচের ওপারে রাখা কিছু বস্তু নয়, এ হলো আমাদের রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতার দলিল। এখানে আছে শহীদদের ব্যবহৃত নিথর সব সামগ্রী, আছে স্বজনদের লেখা শেষ চিঠিখানি যা পড়লে আজও চোখের কোণ ভিজে ওঠে। প্রায় ২১ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে চারটি গ্যালারিতে এমনভাবে সাজানো হয়েছে আমাদের সংগ্রামকে, যে একবার ঢুকলে আপনি ভুলে যাবেন যে আপনি ২০১৬ বা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আছেন; মনে হবে আপনি সেই রণাঙ্গনেরই কোনো এক সাক্ষী।
টেরাকোটা থেকে শুরু করে সত্তরের নির্বাচন, আর ৭ই মার্চের সেই বজ্রকণ্ঠ থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস কাহিনী—সবই এখানে জীবন্ত। এমনকি বিদেশি বন্ধুদের সহায়তার সেই অসামান্য নিদর্শনাদি দেখে আপনার মনে হবে, বিশ্ব বিবেক সেদিন বাংলার পাশেই ছিল। নয় তলা এই ভবনের পরতে পরতে আমাদের জয় আর মূল্যবোধের যে জয়গান গাওয়া হয়েছে, তা না দেখলে বাঙালির পুনর্জন্মই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কী দেখবেন
আধুনিক স্থাপত্যে নির্মিত এই জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ হলো এর চারটি বিশেষ গ্যালারি। ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’ গ্যালারিতে প্রাচীন বঙ্গ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের বিবর্তন দেখা যায়। ‘আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ’ গ্যালারিতে ৭ই মার্চের ভাষণের ভিডিও এবং ২৫শে মার্চের কালরাতের বর্বরতার নিদর্শন আছে। যুদ্ধের শরণার্থী জীবন ও গেরিলা যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ গ্যালারিটি। সবশেষে ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’ গ্যালারিতে বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলো প্রদর্শিত। এছাড়া জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ব্রোঞ্জের ম্যুরাল, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্র, চিঠিপত্র এবং শহীদদের দেহাবশেষ সংরক্ষিত আছে। নয় তলা ভবনে আরও পাবেন আর্কাইভ, ল্যাবরেটরি এবং মিলনায়তন।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে বাস, সিএনজি বা নিজস্ব যানে করে শেরে-বাংলা নগরের আগারগাঁও এলাকায় আসুন।
বিআইসিসি (BICC) বা পর্যটন ভবনের কাছাকাছি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আধুনিক ভবনটি সহজেই নজরে পড়বে।
প্লট F11/A ও F11/B-তে অবস্থিত জাদুঘরের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করুন।
প্রবেশ ফি ও সময়সূচি
জাদুঘরটি সপ্তাহের প্রতি রবিবার বন্ধ থাকে। বাকি ছয় দিন দর্শনার্থীদের জন্য নিচের সময়সূচি ও ফি কার্যকর হয়:
| ধরণ | টিকিট মূল্য (টাকা) | সময়সূচি |
|---|---|---|
| সাধারণ দর্শনার্থী | ৫০ | সকাল ১০টা – সন্ধ্যা ৬টা (গ্রীষ্মকাল) |
| ৫ থেকে ১৮ বছর | ২০ | সকাল ১০টা – বিকাল ৫টা (শীতকাল) |
| সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থী | ৫০ | রবিবার বন্ধ |
| বিদেশী দর্শনার্থী | ৫০০ | জাতীয় দিবসেও খোলা থাকে |
ভ্রমণ টিপস
ইতিহাসের খুঁটিনাটি বুঝতে এবং চারটি গ্যালারি ভালো করে ঘুরে দেখতে হাতে অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা সময় নিয়ে আসা ভালো।
parking tip: জাদুঘরের নিজস্ব নয় তলা ভবনে কার পার্কিংয়ের সুবিধা রয়েছে, তাই নিজস্ব গাড়ি নিয়ে স্বচ্ছন্দে আসতে পারেন। contact tip: বিশেষ কোনো প্রয়োজনে বা গ্রুপ ভিজিটের জন্য জাদুঘরের ফোন নম্বর ০২-২২২২৪৮৬৫২-৩ অথবা ০৯৬১১৬৭৭২২৩-এ যোগাযোগ করে নিতে পারেন।
দেশের ভেতরে কম খরচে ফ্লাইট ও হোটেল বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন — সব এক জায়গায়, ঝামেলা ছাড়া।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সপ্তাহে কোন দিন বন্ধ থাকে?
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সপ্তাহের প্রতি রবিবার বন্ধ থাকে। তবে বিশেষ জাতীয় দিবসগুলোতে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।
জাদুঘরটিতে কি শিশুদের জন্য টিকিটের কোনো ছাড় আছে?
হ্যাঁ, ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্য মাত্র ২০ টাকা ধরা হয়েছে, যেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ফি ৫০ টাকা।
আগারগাঁওয়ের এই জাদুঘরটি কখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ২২ শে মার্চ সেগুনবাগিচায়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল এটি আগারগাঁওয়ে নিজস্ব নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়।
তথ্যসূত্র: Vromon Guide

