bangladesh · Editorial

নর্থব্রুক হল ভ্রমণ: বুড়িগঙ্গার তীরে ইতিহাসের সাক্ষী এই রক্তিম লালকুঠি

ঢাকার ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গার পাড়ে অবস্থিত নর্থব্রুক হল বা লালকুঠি। মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের এই অনন্য নিশান দেখতে এখনই পড়ুন।

নর্থব্রুক হল ভ্রমণ: বুড়িগঙ্গার তীরে ইতিহাসের সাক্ষী এই রক্তিম লালকুঠি

সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের সেই বিখ্যাত উক্তিটা মনে আছে তো? “দুনিয়াটা মস্ত বড়, কিন্তু তার আস্ত সৌন্দর্য যদি এক লাল দালানে বন্দি থাকে, তবে কষ্ট করে অত দূরে যাওয়ার দরকার কী?” ১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যরিং নর্থব্রুক যখন ঢাকায় পা রাখলেন, তাকে খুশি করতে ফরাশগঞ্জের বুড়িগঙ্গা পাড়ে যে ইমারত খাড়া করা হলো, তার নামই নর্থব্রুক হল। কিন্তু গাম্ভীর্যপূর্ণ সেই ব্রিটিশ নাম ছাপিয়ে স্থানীয়দের মুখে মুখে ভবনটির নাম হয়ে গেল ‘লালকুঠি’।

এক বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটির দিকে তাকালে আপনি ধাঁধায় পড়ে যাবেন। এর উত্তর দিকটা দেখলে একরকম মনে হয়, আবার দক্ষিণ দিকে গেলে মনে হবে একদম আলাদা কোনো দালান! মুঘলদের আভিজাত্য আর ইউরোপীয় কারুকাজ এমনভাবে মিশেছে যে, ১৯২৬ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন এখানে সংবর্ধনা নিতে এসেছিলেন, তিনিও নিশ্চয়ই এর অষ্টভুজাকৃতির মিনারের প্রেমে পড়েছিলেন।

আজ হয়তো সেই আগের জৌলুস নেই, কিন্তু এর অশ্বখুরাকৃতি দরজা আর অর্ধ-বৃত্তাকার নকশাগুলো এখনো ফিসফিস করে ইতিহাসের গল্প বলে। ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব আর ডায়াবেটিক সমিতির ভিড়েও লালকুঠির চূড়াগুলো সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে বলে।

কী দেখবেন

নর্থব্রুক হলের প্রধান আকর্ষণ এর অদ্ভূত স্থাপত্যশৈলী। ভবনের দুই পাশে ৪টি অষ্টভুজাকৃতির কারুকার্যখচিত মিনার রয়েছে যা মুঘল ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। এর উত্তর দিকের প্রবেশ পথগুলো অশ্বখুরাকৃতি ও অর্ধ-বৃত্তাকার। হলের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের নকশায় এতটাই ভিন্নতা যে প্রথম দর্শনে এদের পৃথক ভবন বলে বিভ্রম হতে পারে। শুরুতে এটি টাউন হল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরে এখানে ‘জনসন হল’ নামে একটি ক্লাব ঘর ও গণগ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এই প্রাঙ্গণে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব, ডায়াবেটিক সমিতি এবং সিটি করপোরেশনের ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থাকলেও এর প্রাচীন কারুকাজগুলো এখনো টিকে আছে।

কীভাবে যাবেন

গুলিস্তান বা সদরঘাট যাত্রা

ঢাকা শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে বা সিএনজিতে করে প্রথমে গুলিস্তান অথবা সদরঘাট এলাকায় চলে আসুন।

রিকশা ভ্রমণ

সদরঘাট বা গুলিস্তান থেকে সরাসরি রিকশা ভাড়া করে ফরাশগঞ্জের নর্থব্রুক হল বা স্থানীয়দের পরিচিত ‘লালকুঠি’তে পৌঁছানো যায়।

পদব্রজ

সদরঘাট টার্মিনালের খুব কাছে হওয়ায় চাইলে সদরঘাট থেকে নর্থব্রুক হল রোড ধরে সামান্য হেঁটেও ঐতিহাসিক এই স্থানে পৌঁছাতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন

ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় এখানে সব ধরণের বাজেটের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আপনি চাইলে বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল কিংবা পুরান ঢাকার সাশ্রয়ী হোটেলে রাত কাটাতে পারেন।

বাজেট বান্ধব

বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ফকিরাপুল, পল্টন, গুলিস্তান

৫০০ – ১৫০০ | সাধারণ মানের অসংখ্য আবাসিক হোটেল।

মধ্যম মানের

পুরান ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা

১৫০০ – ৪০০০ | মাঝারি মানের ভালো আবাসিক হোটেল।

লাক্সারি

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ, লা মেরিডিয়েন, র‍্যাডিসন ব্লু

১৫০০০+ | আন্তর্জাতিক মানের ৫ তারকা হোটেল ও আভিজাত্য।

কোথায় খাবেন

পুরান ঢাকা মানেই রসনাবিলাসের স্বর্গ। নর্থব্রুক হল দেখে ফেরার পথে কাজি আলাউদ্দিন রোডের বিখ্যাত হাজির বিরিয়ানি বা হানিফের তেহরি খেয়ে দেখতে পারেন। গরমে প্রাণ জুড়াতে হোটেল রয়েলের পেস্তা বাদামের শরবত কিংবা লালবাগ শাহী মসজিদের পাশের মোহন মিয়ার জুস জুতসই। এছাড়া বেচারাম দেউড়ি রোডের নান্নার মোরগ পোলাও তো আছেই।

✈️ Tripzao টিপ

দেশের ভেতরে কম খরচে ফ্লাইট ও হোটেল বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন — সব এক জায়গায়, ঝামেলা ছাড়া।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

নর্থব্রুক হল কেন ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিত?

১৮৭৪ সালে নির্মিত এই ভবনের রং টকটকে লাল হওয়ার কারণে স্থানীয় লোকজন একে নর্থব্রুক হলের বদলে ‘লালকুঠি’ নামেই বেশি ডাকতেন এবং কালক্রমে এটি এই নামেই সুপরিচিত হয়।

এই ভবনের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে কি?

হ্যাঁ, ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এই নর্থব্রুক হলেই এক রাজকীয় সংবর্ধনা প্রদান করেছিল।

নর্থব্রুক হলের স্থাপত্যের বিশেষত্ব কী?

এটি মুঘল স্থাপত্যরীতি ও ইউরোপীয় কারুকাজের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এর দুই পাশে ৪টি অষ্টভুজাকৃতির মিনার এবং অশ্বখুরাকৃতি প্রবেশদ্বার রয়েছে যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

তথ্যসূত্র: Vromon Guide

About the Author

Tripzao Journal writer — travel journalist covering Asia, Europe and beyond.