
সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেব বেঁচে থাকলে বুড়িগঙ্গার ওপাড়ে দাঁড়িয়ে নির্ঘাত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, “আহা! এককালের প্রমোদ উদ্যান আজ ঘিঞ্জি বসতির ভিড়ে হাপিত্যেশ করছে।” ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে সুবেদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম খাঁ যখন এই প্রাসাদটি বানিয়েছিলেন, তখন এটি ছিল চারদিকে পানি বেষ্টিত এক শান্ত দ্বীপ বা ‘জাজিরা’। আর সেই জাজিরা থেকেই আজকের নাম—জিঞ্জিরা প্রাসাদ।
ইতিহাসের এক বিষাদময় অধ্যায় জড়িয়ে আছে এই ইটের দেয়ালগুলোতে। পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর নবাব সিরাজদ্দৌলার পরিবারকে এখানেই বন্দি করে রাখা হয়েছিল। স্থানীয়রা এখনো কানে কানে বলে, বুড়িগঙ্গার তলদেশ দিয়ে নাকি লালবাগ কেল্লার সাথে এই প্রাসাদের এক গোপন সুড়ঙ্গ ছিল, যা দিয়ে মোগল সেনাপতিরা যাতায়াত করতেন!
আজ সেই নির্জন হাবেলী নেই, চারদিকে অট্টালিকা আর দোকানপাটের ভিড়। তবুও বড় কাটরার আদলে তৈরি সেই রাজকীয় প্রবেশ তোরণ আর প্রাসাদের অবশিষ্টাংশ এখনো ইতিহাসের সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলুন, বুড়িগঙ্গার ওপাড়ে সেই ‘দ্বীপের প্রাসাদ’ থেকে ঘুরে আসা যাক।
কী দেখবেন
জিঞ্জিরা প্রাসাদে গিয়ে আপনি মোগল আমলের সেই কারুকার্যখচিত প্রবেশ তোরণটি দেখতে পাবেন, যা বড় কাটরার স্থাপত্যশৈলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। বর্তমানে মূল প্রাসাদের দুটি ভবন টিকে আছে। এক সময় এই প্রাসাদে যাওয়ার জন্য কাঠের পুল ব্যবহার করা হতো এবং এটি ছিল ঘন গাছগাছালির ছায়ায় ঘেরা। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এই প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং এর গঠনশৈলী আপনাকে মুগ্ধ করবে। এছাড়া প্রাসাদের চারপাশের ঘিঞ্জি পরিবেশের মাঝেও মোগল আভিজাত্যের যে ছাপ এখনো অবশিষ্ট আছে, তা প্রত্নতত্ত্ব প্রেমীদের জন্য দারুণ এক প্রাপ্তি।
কীভাবে যাবেন
রাজধানীর যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস বা সিএনজিতে করে প্রথমে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আসতে হবে।
সদরঘাট থেকে নৌকা বা ট্রলারে করে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে ওপাড়ে পৌঁছাতে হবে।
সোয়ারীঘাট সংলগ্ন বড় কাটরায় পৌঁছে স্থানীয় কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই ঘিঞ্জি গলি পেরিয়ে জিঞ্জিরা প্রাসাদের সন্ধান পাওয়া যাবে।
কোথায় থাকবেন
পুরান ঢাকা এলাকায় থাকার জন্য অনেক সাশ্রয়ী হোটেল রয়েছে, তবে আপনি চাইলে ঢাকার মূল শহরের বিলাসবহুল হোটেলেও থাকতে পারেন।
ফকিরাপুল, পল্টন ও গুলিস্তান
৫০০ – ২,৫০০ | সাধারণ মানের অসংখ্য আবাসিক হোটেল এখানে পাওয়া যাবে।
পুরান ঢাকা ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউ
৩,০০০ – ৬,০০০ | মোটামুটি ভালো মানের এবং ঐতিহ্যের কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা।
প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ / লা মেরিডিয়েন
১৫,০০০ – ৩০,০০০ | আভিজাত্য আর সকল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ৫ তারকা হোটেল।
বিলাসবহুল হোটেলের তালিকায় র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনও উল্লেখযোগ্য।
কোথায় খাবেন
পুরান ঢাকায় এসে রসনা বিলাস হবে না, তা কি হয়? কাজি আলাউদ্দিন রোডের বিখ্যাত হাজির বিরিয়ানি, হোটেল রয়েলের জিভে জল আনা পেস্তা বাদামের শরবত, এবং বেচারাম দেউড়ি রোডে নান্নার মোরগ পোলাও চেখে দেখতে ভুলবেন না। এছাড়া লালবাগ শাহী মসজিদের পাশের মোহন মিয়ার জুস এবং হানিফের তেহরি আপনার ভ্রমণকে পূর্ণতা দেবে।
ভ্রমণ টিপস
সদরঘাট থেকে নৌকা পার হওয়ার সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা এবং সূর্যাস্তের আগে প্রাসাদ এলাকা ঘুরে দেখা নিরাপদ।
খাবার টিপ: পুরান ঢাকার খাবারের আসল স্বাদ পেতে দুপুরের খাবারের জন্য নান্না বা হাজির বিরিয়ানি বেছে নিতে পারেন। লোকেশন টিপ: জিঞ্জিরা বর্তমানে একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা, তাই গোলকধাঁধার মতো গলিগুলোতে পথ চিনতে স্থানীয়দের সাহায্য নিন।
দেশের ভেতরে কম খরচে ফ্লাইট ও হোটেল বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন — সব এক জায়গায়, ঝামেলা ছাড়া।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
জিঞ্জিরা প্রাসাদের নামকরণের রহস্য কী?
‘জাজিরা’ শব্দের অর্থ হলো দ্বীপ। ১৬২০ সালে প্রাসাদটি যখন তৈরি করা হয়, তখন এটি চারদিকে পানি বেষ্টিত ছিল বলে একে জিঞ্জিরা বা দ্বীপের প্রাসাদ বলা হয়।
সিরাজদ্দৌলার সাথে এই প্রাসাদের সম্পর্ক কী?
পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের পর তাঁর পরিবারকে এই জিঞ্জিরা প্রাসাদেই প্রেরণ করা হয়েছিল এবং সেখানে তাঁরা অবস্থান করেছিলেন।
লালবাগ কেল্লার সাথে সুড়ঙ্গপথের গল্পটি কি সত্যি?
স্থানীয়দের মধ্যে একটি প্রচলিত লোককথা আছে যে, বুড়িগঙ্গার তলদেশ দিয়ে লালবাগ কেল্লার সাথে জিঞ্জিরা প্রাসাদের একটি সুড়ঙ্গ ছিল যা মোগল সেনা কর্মকর্তারা ব্যবহার করতেন।
তথ্যসূত্র: Vromon Guide
