
পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি, ধোঁয়া ওঠা চা আর বইয়ের ঘ্রাণ—তারই মাঝে শ্রীশদাস লেনে একচিলতে উঠোন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘বিউটি বোর্ডিং’। একে কেবল একটা আবাসিক হোটেল ভাবলে মস্ত ভুল করবেন। এর প্রতিটি ইটে, নোনা ধরা দেয়ালে মিশে আছে শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর পদচিহ্ন।
১৯৪৯ সাল থেকে আজ অবধি, এই জীর্ণ দালানটি যেন বাঙালির শিল্প-সাহিত্য আর আড্ডার এক অবিচ্ছেদ্য তীর্থস্থান। আধুনিক কাঁচের দালানের ভিড়ে বিউটি বোর্ডিং এখনো তার পুরোনো মেজাজ ধরে রেখেছে ঠিক যেমনটা ছিল সেই দেশভাগের ঠিক পরের দিনগুলোতে। চলুন, ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে আসা যাক।
কী দেখবেন
বিউটি বোর্ডিং মূলত একটি ঐতিহাসিক দোতলা ভবন ও তার সামনে থাকা খোলামেলা উঠোন। এখানে দেখার মূল বিষয় হলো এর ইতিহাস ও পরিবেশ। ১১ কাঠা জমির ওপর এই স্থাপনাটি গড়ে তোলেন প্রহ্লাদ সাহা ও নলিনী মোহন সাহা। এটি একসময় সুধীর চন্দ্র দাসের ছাপাখানা ছিল, যেখান থেকে ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এখানকার প্রতিটি ঘর আর বারান্দা আপনাকে নিয়ে যাবে পঞ্চাশ-ষাটের দশকের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সোনালী সময়ে। এর অন্দরমহলে আজও সেই পুরনো দিনের আসবাব আর পরিবেশ টিকে আছে। শ্রীশদাস লেনের এই জীর্ণ কিন্তু মায়াবী ভবনটি দেখতে কোনো প্রবেশ ফি লাগে না।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস বা মেট্রো রেলে মতিঝিল স্টেশনে নামুন। মেট্রো রেলে এলে যানজট এড়িয়ে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব।
মতিঝিল বা গুলিস্তান থেকে রিকশা বা লোকাল বাসে (ভাড়া ২০-৪০ টাকা) ভিক্টোরিয়া পার্ক বা বাংলাবাজার বইয়ের মার্কেটে পৌঁছান। মহাখালী থেকে আজমেরী বা স্কাইলাইন বাসে সরাসরি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসা যায়।
বাংলাবাজার মোড় থেকে পায়ে হেঁটে ৫ মিনিটের পথ। অথবা সদরঘাট টার্মিনাল থেকে রিকশায় ৫-৭ মিনিটে বিউটি বোর্ডিং (১নং শ্রীশদাস লেন) পৌঁছে যাবেন।
কোথায় থাকবেন
এখানে থাকার ব্যবস্থা বেশ সাদামাটা ও প্রাচীন ধাঁচের। বর্তমানে মোট ২৭টি কক্ষ আছে সিঙ্গেল ও ডাবল বেড মিলিয়ে। যারা ইতিহাসের একদম ভেতরে রাত কাটাতে চান, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।
সিঙ্গেল রুম (সাধারণ)
৫০০ – ৮০০ BDT | ছোট ঘর, মৌলিক সুবিধাসম্পন্ন।
ডাবল রুম (সাধারণ)
১,০০০ – ১,৫০০ BDT | দুইজনের থাকার উপযোগী কক্ষ।
ডাবল রুম (উন্নত/বড়)
১,৮০০ – ২,০০০ BDT | বিউটি বোর্ডিংয়ের সবচেয়ে ভালো ক্যাটাগরির রুম।
বুকিং বা বিস্তারিত তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন: ০১৭৮৬-২৬৮৬০৮।
কোথায় খাবেন
বিউটি বোর্ডিংয়ের খাবারের স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। এখানকার প্রধান আকর্ষণ সরিষা ইলিশ, যার এক পিসের দাম পড়বে ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এছাড়া রুই, কাতলা, চিতল, পাবদা, বোয়ালসহ রকমারি মাছের পদের দামও নাগালের মধ্যে। মুরগি বা খাসির মাংসের স্বাদ নিতে গুনতে হবে ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। যারা হালকা কিছু খুঁজছেন, তারা ১০০-১২০ টাকায় খিচুড়ি কিংবা ১৫০-১৮০ টাকায় তাদের বিখ্যাত মুড়িঘণ্ট ট্রাই করতে পারেন। সাথে গরম ভাত আর ভর্তা-ডাল তো আছেই।
প্রবেশ ফি ও সময়সূচি
বিউটি বোর্ডিং পরিদর্শনে কোনো টিকিট কাটতে হয় না। তবে আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট হওয়ায় এটি সবসময়ই খোলা থাকে।
| আইটেম | বিবরণ | খরচ (BDT) |
|---|---|---|
| সরিষা ইলিশ | মাছের আকারভেদে প্রতি পিস | ৩৫০ – ৬০০ |
| মাংস (মুরগি/খাসি) | প্রতি সার্ভিং | ২৫০ – ৪৫০ |
| অন্যান্য পদ | খিচুড়ি, পোলাও বা মুড়িঘণ্ট | ১০০ – ১৮০ |
| থাকার রুম | সিঙ্গেল ও ডাবল বেড | ৫০০ – ২,০০০ |
ভ্রমণ টিপস
সরিষা ইলিশ আর মুড়িঘণ্টের স্বাদ নিতে চাইলে লাঞ্চের সময়ের কিছুটা আগে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
আড্ডা টিপস: বিকেলে গেলে এখনো অনেক গুণী মানুষের দেখা পেতে পারেন যারা নিয়মিত এখানে আড্ডা দেন। ছবি তোলা: ভেতরে ছবি তোলার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নেওয়া ভালো। লোকেশন টিপস: বাংলাবাজার এলাকায় রাস্তা খুব সরু, তাই বড় গাড়ি না নিয়ে রিকশা বা পায়ে হাঁটা বেশি সুবিধাজনক।
দেশের ভেতরে কম খরচে ফ্লাইট ও হোটেল বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন — সব এক জায়গায়, ঝামেলা ছাড়া।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
বিউটি বোর্ডিং যাওয়ার সহজ উপায় কী?
সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মেট্রো রেলে মতিঝিল এসে সেখান থেকে রিকশায় বাংলাবাজার আসা। সদরঘাট বা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও রিকশায় ৫-৭ মিনিটে এখানে পৌঁছানো যায়।
এখানে কি থাকার ব্যবস্থা আছে?
হ্যাঁ, এখানে মোট ২৭টি কক্ষ আছে। রুমভেদে ভাড়া ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বিউটি বোর্ডিংয়ের বিখ্যাত খাবার কোনগুলো?
এখানকার সরিষা ইলিশ সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া চিতল, পাবদা বা রুই মাছের ঝোল এবং ঐতিহ্যবাহী মুড়িঘণ্ট পর্যটকদের প্রিয় খাবারের তালিকায় থাকে।
তথ্যসূত্র: Vromon Guide
