bangladesh · Editorial

রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ গাইড: ইতিহাসের রক্তভেজা ইটখোলা

ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ (Shahid Intellectual Memorial) মুক্তিযুদ্ধের এক শোকাতুর দলিল। যাতায়াত ও ইতিহাস জানতে এখনই পড়ুন।

রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ গাইড: ইতিহাসের রক্তভেজা ইটখোলা

ঢাকার মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার এলাকাটি মুঘল আমলে পরিচিত ছিল ‘কুমারতলী’ নামে। তুরাগ নদীর পাড়ে লাল মাটির টানে এখানে কুমোররা বসতি গড়েছিলেন, মৃৎশিল্পের কারুকাজে মুখর থাকত চারপাশ। কিন্তু ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের এক অভিশপ্ত রাত এই জনপদের পরিচয় চিরতরে বদলে দিল। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি হানাদাররা যখন এদেশের সূর্যসন্তানদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করল, তখন এই রায়ের বাজারের ইটখোলাই হয়ে উঠেছিল তাঁদের নিথর দেহের স্তূপ।

মুজতবা আলীর ভাষায় বলতে গেলে, ইতিহাসের এমন কিছু পাতা থাকে যা রক্তে ভেজা, আর রায়ের বাজার সেই ডায়েরির এক বিষাদময় অধ্যায়। ১৯৯৯ সালে স্থপতি ফরিদউদ্দীন আহমেদ এবং জামি-আল-শফি সেই শোককে রূপ দিলেন স্থাপত্যে। ৩.৫১ একরের এই প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে আজও মনে হয়, ইট-পাথরের দেয়ালগুলো যেন ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব কিংবা শহিদুল্লাহ কায়সারের না বলা কথাগুলো ফিসফিস করে বলছে।

আপনি যদি যান্ত্রিক নগরের মাঝে দাঁড়িয়ে একটু শিকড়ের ঘ্রাণ আর স্বাধীনতার করুণ ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে চান, তবে রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ আপনার গন্তব্যের তালিকায় থাকা চাই-ই চাই। ১৭ মিটারেরও বেশি উঁচুর সেই ভাঙা দেয়াল আর কালো গ্র্যানাইট পাথরের স্তম্ভ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, এই স্বাধীনতা কতখানি রক্তমূল্যে কেনা।

কী দেখবেন

রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রতীকী স্থাপত্য। এখানে ১৭.৬৮ মিটার উঁচু এবং ১১৫.৮২ মিটার দীর্ঘ একটি বাঁকানো ইটের দেয়াল রয়েছে, যার দুই প্রান্ত ভাঙা। এই দেয়ালটি মূলত সেই ইটখোলাকে নির্দেশ করে যেখানে শহীদদের লাশ পাওয়া গিয়েছিল, আর ভাঙা অংশটি শোকের গভীরতা বুঝায়। দেয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বর্গাকৃতির জানালা আছে, যা দিয়ে পেছনের আকাশ দেখা যায়—এটি কষ্টের মাঝেও আশার প্রতীক। দেয়ালের সামনে একটি জলাধার থেকে কালো গ্র্যানাইট পাথরের স্তম্ভ উঠে এসেছে, যা শোকের গভীরতা প্রকাশ করে। পুরো ৩.৫১ একর এলাকাটি অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ। ভবিষ্যতে এখানে একটি ছোট জাদুঘর, পাঠাগার ও কবরস্থান নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

কীভাবে যাবেন

মোহাম্মদপুর পৌঁছানো

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত (যেমন: মতিঝিল, উত্তরা বা গাবতলী) থেকে বাসে বা সিএনজিতে করে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে আসুন।

রিকশা যাত্রা

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড বা বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে রিকশায় সরাসরি ‘রায়ের বাজার বধ্যভূমি’ বা ‘বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ’ বললেই পৌঁছে দেবে।

ব্যক্তিগত গাড়ি

নিজস্ব গাড়ি বা সিএনজিতে ধানমন্ডি বা শংকর হয়ে খুব সহজেই রায়ের বাজার এলাকায় প্রবেশ করা যায়।

প্রবেশ ফি ও সময়সূচি

বিষয়সময়/বিবরণমন্তব্য
প্রবেশ মূল্যবিনামূল্যেকোনো টিকেটের প্রয়োজন নেই
পরিদর্শনের সময়সকাল ৯:০০ টা – বিকাল ৫:০০ টাপ্রতিদিন উন্মুক্ত
নিষেধাজ্ঞারাতের বেলা প্রবেশ নিষেধনিরাপত্তা ও গাম্ভীর্য রক্ষায়

ভ্রমণ টিপস

⭐ দরকারী টিপ

এটি একটি অত্যন্ত শোকাবহ ও জাতীয় গুরুত্বের স্থান, তাই চত্বরে শোরগোল করবেন না।

পরিবেশ টিপস: স্মৃতিসৌধের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন, কোথাও ময়লা ফেলবেন না। ফটোগ্রাফি টিপস: দেয়াল বা স্মারকের ওপর উঠে ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন। সময় টিপস: দুপুরের কড়া রোদ এড়িয়ে সকালে বা বিকেলের দিকে গেলে শান্তিতে ঘুরে দেখতে পারবেন।

✈️ Tripzao টিপ

দেশের ভেতরে কম খরচে ফ্লাইট ও হোটেল বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন — সব এক জায়গায়, ঝামেলা ছাড়া।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

রায়ের বাজার স্মৃতিসৌধটি কেন নির্মাণ করা হয়েছিল?

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে মেধাবী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে রায়ের বাজারের ইটখোলায় ফেলে রেখেছিল, তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এটি নির্মিত হয়েছে।

এই স্মৃতিসৌধটির স্থপতি কারা এবং এটি কবে সম্পন্ন হয়?

স্থপতি ফরিদউদ্দীন আহমেদ এবং স্থপতি জামি-আল-শফি-র নকশায় ১৯৯৬ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৯৯ সালে শেষ হয়।

এখানে প্রবেশের জন্য কি কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে?

হ্যাঁ, দর্শনার্থীদের জন্য এটি প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে, তবে রাতে সাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তথ্যসূত্র: Vromon Guide

M
About the Author
muhammadahsanalhisham@gmail.com

Tripzao Journal writer — travel journalist covering Asia, Europe and beyond.