
ঢাকা শহরের ব্যস্ততার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো মুঘল ইতিহাস — লালবাগ কেল্লা। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় ৩৪০ বছরের পুরনো এই দুর্গে ঢুকলেই মনে হবে সময় থেমে গেছে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পরিকল্পনা, যুবরাজ শাহজাদা আজমের শুরু, আর শায়েস্তা খাঁনের অসমাপ্ত কাজ — এই কেল্লার পেছনে আছে এক মর্মস্পর্শী গল্প।
মাত্র ৩০ টাকার টিকিটে যে অভিজ্ঞতা পাবেন, ঢাকার ভেতরে এমন আর কোথাও মেলে না। চলুন বিস্তারিত জেনে নেই — কেল্লায় কী আছে, কীভাবে যাবেন, টিকিটের দাম, এবং কোন সময়ে গেলে সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা পাবেন।
দ্রুত তথ্য
- অবস্থান: লালবাগ, পুরান ঢাকা (বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে)
- প্রবেশ ফি: বাংলাদেশি ৩০৳, SAARC ২০০৳, বিদেশি ৪০০৳
- সাপ্তাহিক বন্ধ: রবিবার (সোমবার অর্ধদিন)
- ভ্রমণ সময়: অন্তত ২ ঘণ্টা
- নির্মাণ শুরু: ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দ
লালবাগ কেল্লার ইতিহাস
সম্রাট আওরঙ্গজেব লালবাগ কেল্লা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, কিন্তু তাঁর পুত্র যুবরাজ শাহজাদা আজম ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে এই দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। শুরুতে এই কেল্লার নাম ছিল আওরঙ্গবাদ দূর্গ বা আওরঙ্গবাদ কেল্লা।
কিন্তু গল্পটা এখানেই বাঁক নেয়। ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার শায়েস্তা খাঁনের কন্যা ইরান দুখত পরীবিবি মারা যান। কন্যাশোকে মুহ্যমান শায়েস্তা খাঁ কেল্লা নির্মাণের কাজ চিরতরে বন্ধ করে দেন। সেই কারণেই আজও এই কেল্লা অসমাপ্ত।
১৮৪৪ সালে আওরঙ্গবাদ এলাকার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় লালবাগ। এলাকার নামের সাথে সাথে কেল্লাটির নামও পরিবর্তিত হয়ে লালবাগ কেল্লা হিসেবে পরিচিত হয়। বর্তমানে সুবেদার শায়েস্তা খাঁনের বাসভবন ও দরবার হল ‘লালবাগ কেল্লা জাদুঘর’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
লালবাগ কেল্লায় কী কী দেখবেন?
লালবাগ কেল্লায় তিনটি ফটক থাকলেও দুইটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফটক দিয়ে প্রবেশের সাথে সাথেই মনোরম বাগান মনকে প্রফুল্ল করে তোলে।
পরীবিবির সমাধি: প্রবেশ পথ ধরে সোজা এগিয়ে গেলে সামনে শায়েস্তা খাঁনের কন্যা পরীবিবির স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত সমাধি সৌধ চোখে পড়বে। সমাধি সৌধটি বর্গাকৃতির, প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ২০.২ মিটার। মার্বেল পাথরে তৈরি এই সমাধি সৌধটি অনন্য কারুকার্যপূর্ণ। মূল সমাধি সৌধের উপরে তামার পাত দিয়ে মোড়ানো একটি কৃত্রিম গম্বুজ আছে — পুরো বাংলাদেশে এমন গম্বুজ আর কোথাও নেই।
এছাড়াও দর্শনীয় জিনিসগুলোর মধ্যে আছে:
- লালবাগ দুর্গ মসজিদ — মুঘল স্থাপত্যের সুন্দর উদাহরণ
- সুন্দর ফোয়ারা — মুঘল আমলের জলব্যবস্থা
- আরও কিছু সমাধি — ইতিহাসের নীরব সাক্ষী
- তৎকালীন যুদ্ধে ব্যবহৃত কামান/তোপ — মুঘল সামরিক শক্তির স্মারক
- লালবাগ কেল্লা জাদুঘর — শায়েস্তা খাঁনের আমলের অনেক নিদর্শন
লালবাগ কেল্লার প্রবেশ টিকিট মূল্য
লালবাগ কেল্লার প্রবেশ গেটের ডান পাশেই রয়েছে টিকিট কাউন্টার।
| দর্শনার্থীর ধরন | প্রবেশ ফি (টাকা) |
|---|---|
| বাংলাদেশি পর্যটক | ৩০ |
| SAARC ভুক্ত দেশের পর্যটক | ২০০ |
| বিদেশি পর্যটক | ৪০০ |
| মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী | ১০ |
| ৫ বছরের নিচের শিশু | বিনামূল্যে |
দর্শনার্থীরা চাইলে myGOV ওয়েবসাইট থেকে ঘরে বসেই QR কোডযুক্ত অনলাইন টিকিট কিনতে পারবেন। মোবাইলে দেখিয়ে বা প্রিন্ট আউট করে ব্যবহার করা যায় — কাউন্টারে লাইনে দাঁড়াতে হবে না।
লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের সময়সূচি
লালবাগ কেল্লা রবিবার সম্পূর্ণ বন্ধ এবং সোমবার অর্ধদিন বন্ধ থাকে। সকল বিশেষ সরকারি ছুটির দিনেও বন্ধ থাকে। গ্রীষ্ম ও শীতকাল অনুযায়ী সময়সূচি পরিবর্তিত হয়:
এপ্রিল–সেপ্টেম্বর (গ্রীষ্মকাল)
- রবিবার: সাপ্তাহিক বন্ধ
- সোমবার: দুপুর ২:৩০টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত খোলা
- শুক্রবার: সকাল ১০:০০টা থেকে বিকাল ৬:০০টা (বিরতি: দুপুর ১২:৩০টা থেকে ০২:৩০টা)
- সপ্তাহের বাকি দিন: সকাল ১০:০০টা থেকে বিকাল ৬:০০টা পর্যন্ত খোলা
অক্টোবর–মার্চ (শীতকাল)
- রবিবার: সাপ্তাহিক বন্ধ
- সোমবার: দুপুর ১:৩০টা থেকে বিকাল ৫:০০টা পর্যন্ত খোলা
- শুক্রবার: সকাল ৯:০০টা থেকে বিকাল ৫:০০টা (বিরতি: দুপুর ১২:৩০টা থেকে বিকাল ০২:০০টা)
- সপ্তাহের বাকি দিন: সকাল ৯:০০টা থেকে বিকাল ৫:০০টা পর্যন্ত খোলা
সতর্কতা
সরকারি বিশেষ ছুটির দিনগুলোতে লালবাগ কেল্লা বন্ধ থাকে। যাওয়ার আগে অবশ্যই দিন ও সময় নিশ্চিত করে নিন — অনেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে বন্ধ পান।
লালবাগ কেল্লা কীভাবে যাবেন?
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকেই লালবাগ কেল্লা যাওয়া যায়। সুবিধামতো বাহনে লালবাগ আসতে পারবেন। কয়েকটি জনপ্রিয় রুট:
ঢাকা বা বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার আসুন। সেখান থেকে রিকশা অথবা লেগুনাতে করে কেল্লায় যেতে পারবেন। ভাড়া রিকশায় ৫০–৮০ টাকা।
নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, শাহবাগ, TSC অথবা আজিমপুর এসে রিকশায় করে যেতে পারবেন। শাহবাগ থেকে ৭০–১০০ টাকা।
সদরঘাট থেকে রিকশায় বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে লালবাগ কেল্লায় যেতে পারবেন। নদী পথে এসে এই রুটটাই সুবিধাজনক।
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে CNG তে সরাসরি লালবাগ কেল্লায় আসতে পারবেন — সবচেয়ে আরামদায়ক, কিন্তু একটু দামি।
লালবাগ কেল্লার আশেপাশে কোথায় খাবেন?
কেল্লার ভেতরে খাবার খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে কেল্লার সামনেই বেশ কিছু ভালো মানের রেস্টুরেন্ট আছে — সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার বিখ্যাত খাবার যেমন হাজীর বিরিয়ানি, নান্না বিরিয়ানি, শাহী মোরগ পোলাও খেতে চাইলে চানখারপুল এলাকায় চলে যান।
ভ্রমণ টিপস ও প্ল্যানিং
সময় বরাদ্দ: লালবাগ দুর্গ ভালোভাবে ঘুরে দেখার জন্য অন্তত ২ ঘণ্টা সময় নিয়ে যেতে হবে। তাড়াহুড়োয় গেলে অনেক কিছু মিস করবেন।
আশেপাশের আরও স্পট: দুর্গ ঘুরে দেখার পাশাপাশি কাছাকাছি অবস্থিত আরও কিছু বিখ্যাত জায়গা ঘুরে নিতে পারেন। লালবাগ কেল্লা থেকে সহজেই যাওয়া যায়:
- আহসান মঞ্জিল
- তারা মসজিদ
- আর্মেনিয়ান চার্চ
- হোসেনি দালান
- সদরঘাট
- শোয়ারীঘাট
- ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকা
একদিনের প্ল্যান করলে এই সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার একটা পূর্ণাঙ্গ heritage tour করা যায়।
ঢাকার বাইরে থেকে এসে heritage tour করতে চাইলে — হোটেল ও সিটি ট্যুর প্যাকেজ একসাথে বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন। সব এক জায়গায়, সাশ্রয়ী।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
লালবাগ কেল্লায় বাংলাদেশিদের প্রবেশ ফি কত?
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশ টিকিটের দাম জনপ্রতি ৩০ টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা, এবং ৫ বছরের নিচের শিশুদের প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না।
লালবাগ কেল্লা কখন খোলা থাকে?
লালবাগ কেল্লা রবিবার পুরোপুরি বন্ধ থাকে এবং সোমবার অর্ধদিন বন্ধ। গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত, এবং শীতকালে (অক্টোবর–মার্চ) সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবারে দুপুরে ২ ঘণ্টার বিরতি থাকে।
লালবাগ কেল্লা কে নির্মাণ করেছিলেন?
সম্রাট আওরঙ্গজেবের পরিকল্পনায় তাঁর পুত্র যুবরাজ শাহজাদা আজম ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এই কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলেন, কিন্তু ১৬৮৪ সালে কন্যা পরীবিবির মৃত্যুর পর তিনি কাজ বন্ধ করে দেন। সেই কারণেই কেল্লাটি অসমাপ্ত।
তথ্যসূত্র: Vromon Guide
