
সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের সেই বিখ্যাত ‘দেশে-বিদেশে’র বর্ণনার মতো যদি বলি—ঢাকায় এসে কলা ভবনের সামনে না দাঁড়ালে আপনার ভ্রমণটাই যেন নুন ছাড়া ভাতের মতো বিস্বাদ থেকে যাবে! ৬ ফুট উঁচু বেদির ওপর সটান দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি মূর্তি কেবল সিমেন্ট-বালির কারুকাজ নয়, এ যেন আমাদের একাত্তরের সেই তেজোদীপ্ত হুঙ্কার।
১৯৭৩ সালে যখন ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ এই স্থাপত্যের কাজে হাত দিলেন, তখন হয়তো তিনি কেবল মূর্তি গড়ছিলেন না, গড়ছিলেন এক অমর ইতিহাস। রাইফেল হাতে সেই বদরুল আলম বেনু কিংবা থ্রি নট থ্রি ধরা সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে—তাঁদের অবয়বে ফুটে ওঠা সেই আপোষহীন ভঙ্গি দেখলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। সাথে আছেন হাসিনা আহমেদ, যিনি নারী শক্তির অদম্য সাহসের মডেল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
বড্ড অদ্ভুত ব্যাপার জানেন? খোদ ভাস্করের নাম খচিত কোনো শিলালিপি এখানে নেই। কিন্তু শিলালিপির প্রয়োজনই বা কী? ১২ ফুট উচ্চতার এই বিশাল ভাস্কর্য নিজেই তো প্রতিটা শিক্ষার্থীর হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়ে শোনায়। চলুন, অপরাজেয় বাংলার এই অনন্য নির্মাণশৈলী নিয়ে আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক।
কী দেখবেন
কলা ভবনের আঙিনায় পা রাখলে প্রথমেই আপনার নজর কাড়বে ১২ ফুট উচ্চতার এই বিশাল ভাস্কর্যটি। এটি ৬ ফুট উচ্চতার একটি বেদির ওপর বসানো, যার প্রস্থ ৮ ফুট এবং ব্যাস ৬ ফুট। এখানে আপনি তিনটি ভিন্ন চরিত্রের মুক্তিযোদ্ধা দেখতে পাবেন। ডান হাতে রাইফেলের বেল্ট শক্ত করে ধরে থাকা চরিত্রটি সাধারণ স্বাধীনতাকামী মানুষের উদ্দীপনাকে ফুটিয়ে তোলে। এছাড়া থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে এক যুবক এবং সেবা ও সাহসের প্রতীক হিসেবে একজন নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিমূর্তি এখানে দৃশ্যমান। সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের এই শৈল্পিক সৃষ্টিতে অন্যায় ও বৈষম্য দূর করে সাম্যের গান গাওয়ার এক দৃঢ় প্রত্যয় ফুটে উঠেছে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে শাহবাগগামী বাসে বা সিএনজিতে করে প্রথমে শাহবাগ মোড়ে পৌঁছাতে হবে।
শাহবাগ মোড় থেকে সোজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
শাহবাগ থেকে রিকশায় করে অথবা মাত্র ১০ মিনিট পায়ে হেঁটেই কলা ভবনের সামনে অবস্থিত অপরাজেয় বাংলা দেখতে পাবেন।
প্রবেশ ফি ও সময়সূচি
অপরাজেয় বাংলা দর্শনের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না এবং এটি জনসাধারণের জন্য সব সময় উন্মুক্ত।
| বিষয় | বিস্তারিত | মূল্য (টাকা) |
|---|---|---|
| প্রবেশ ফি | সকলের জন্য | বিনামূল্যে |
| খোলা থাকে | সপ্তাহের ৭ দিন | ২৪ ঘন্টা |
ভ্রমণ টিপস
ভাস্কর্যটির মডেলদের ইতিহাস জানলে আপনার দেখার অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হবে, তাই যাওয়ার আগে এর পেছনের গল্পটি একবার পড়ে নিন।
যাতায়াত টিপ: শাহবাগ থেকে রিকশা নেওয়ার চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া অনেক বেশি উপভোগ্য। ছবি তোলার টিপ: বিকেলের সোনালী আলোয় ভাস্কর্যটির ছবি তুললে এর পাথুরে কাঠামোর তেজ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
দেশের ভেতরে কম খরচে ফ্লাইট ও হোটেল বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন — সব এক জায়গায়, ঝামেলা ছাড়া।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যটি কে নির্মাণ করেছেন?
এটি প্রখ্যাত ভাস্কর শিল্পী সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের সৃষ্টি, যদিও এখানে তাঁর নাম খচিত কোনো শিলালিপি নেই।
ভাস্কর্যটির মডেল কারা ছিলেন?
তিন মুক্তিযোদ্ধার মডেল ছিলেন তৎকালীন আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু, সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে এবং হাসিনা আহমেদ।
এটি নির্মাণ করতে কত সময় লেগেছিল?
অপরাজেয় বাংলার নির্মাণ কাজ ১৯৭৩ সালে শুরু হয়ে দীর্ঘ ৬ বছর পর ১৯৭৯ সালে সমাপ্ত হয়।
তথ্যসূত্র: Vromon Guide