
ভায়া, মিরপুর ১০-এর গোল চত্বর দিয়ে কতবার গিয়েছেন বলুন তো? চকচকে বেনারশি পল্লীর ঠিক পাশেই যে ইতিহাসের এক বীভৎস আর করুণ অধ্যায় ঘুমিয়ে আছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। ১৯৭১ সালে প্রায় দেড় মাস অবরুদ্ধ মিরপুরের এই জায়গাটি তখন পরিচিত ছিল এক সাধারণ ‘পাম্প হাউজ’ হিসেবে। কিন্তু কে জানত, সেই পাম্প হাউজই হয়ে উঠবে পাক হানাদারদের যমপুরী, যেখানে জল্লাদ দিয়ে চলত বাঙালির শিরশ্ছেদ!
১৯৯৯ সালের ১৫ই নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে যখন মাটি খোঁড়া শুরু হলো, বেরিয়ে এল থমকে যাওয়া সময়ের হাহাকার। ৭০টি মাথার খুলি আর ৫২৯২টি হাড়গোড় সাক্ষ্য দিচ্ছিল সেই অন্ধকার দিনগুলোর। স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইনের পরিকল্পনায় ২০০৮ সালে গড়ে তোলা হয় এই ‘জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতি পাঠ’। এটি কেবল একটি স্মারক নয়, বরং বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের এক অবিনশ্বর দলিল।
এখানে এলে দেখবেন সেই অভিশপ্ত কূপ, যার ভেতরে হাজার হাজার বাঙালির প্রাণহীন দেহ আছড়ে পড়ত। ধারণা করা হয়, এই সেফটি ট্যাঙ্কের অন্ধকারে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাঙালির লাশ গুম করা হয়েছিল। শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুজ্জামানের হাতে গড়া ‘জীবন অবিনশ্বর’ ভাস্কর্যটি দেখলে আজও মনে হয়, প্রাণ চলে গেলেও বীরের আদর্শ মরে না।
কী দেখবেন
জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সেই ঐতিহাসিক পাম্প হাউজের ধ্বংসাবশেষ আর সেই ভয়াল কূপ, যেখানে অগণিত শহীদকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। জাদুঘরটিতে রয়েছে খননকালে উদ্ধার হওয়া শহীদদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র—যেমন মেয়েদের শাড়ি, ফ্রক, ওড়না, অলঙ্কার ও জুতা। এছাড়া এখানে শহীদদের বিভিন্ন তথ্য ও পৈশাচিক অত্যাচারের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা আছে। জাদুঘরের পূর্ব পাশে শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুজ্জামানের তৈরি টেরাকোটা ইট ও লোহার অনন্য ভাস্কর্য ‘জীবন অবিনশ্বর’ দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। এই জায়গাটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বধ্যভূমি হিসেবে সংরক্ষিত।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে বাস, সিএনজি বা মেট্রো রেলে চড়ে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে নামুন।
গোল চত্বর থেকে মিরপুর ১১ নম্বরের দিকে অল্প কিছুটা এগোলেই বেনারশি পল্লীর প্রথম গেট দেখা যাবে।
বেনারশি পল্লীর প্রথম গেট ধরে সোজা সামনে কিছুটা আগালেই হাতের কাছে পেয়ে যাবেন জল্লাদখানা বধ্যভূমি।
ভ্রমণ টিপস
জায়গাটি অত্যন্ত পবিত্র ও শোকাবহ, তাই এখানে ঘোরাঘুরির সময় শান্ত থাকুন এবং উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
transport tip: জ্যাম এড়াতে চাইলে মেট্রো রেলে চড়ে সরাসরি মিরপুর ১০ স্টেশনে নামা হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। nearby attraction: হাতে সময় থাকলে ঢাকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বধ্যভূমি যেমন রায়ের বাজার বধ্যভূমি বা বাংলা কলেজ বধ্যভূমিও ঘুরে আসতে পারেন।
দেশের ভেতরে কম খরচে ফ্লাইট ও হোটেল বুক করতে Tripzao ব্যবহার করুন — সব এক জায়গায়, ঝামেলা ছাড়া।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
জল্লাদখানা বধ্যভূমি কবে আবিষ্কৃত হয়?
১৯৯৯ সালের ১৫ই নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে মিরপুর ১০-এর এই স্থানটি খনন করা হলে জল্লাদখানা বধ্যভূমি আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে এটি স্মৃতি পাঠ হিসেবে সংস্কার করা হয়।
এখানে কী কী নিদর্শন সংরক্ষিত আছে?
বধ্যভূমি খননকালে উদ্ধার হওয়া শহীদদের ৭০টি মাথার খুলি, ৫২৯২টি অস্থি খন্ড এবং শহীদদের ব্যবহৃত শাড়ি, ওড়না ও জুতা এখানে সংরক্ষিত আছে। এছাড়া একটি বড় সেফটি ট্যাঙ্ক বা অভিশপ্ত কূপ রয়েছে।
এই বধ্যভূমির নকশা কে করেছেন?
২০০৮ সালে তৎকালীন সরকারের স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইনের সার্বিক পরিকল্পনায় এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রচেষ্টায় এই স্মৃতি পাঠটি তৈরি করা হয়।
তথ্যসূত্র: Vromon Guide